করোনা ভাইরাসের মধ্যে দেশ থেকে ক্ষমতাসীন দলের একজন সিনিয়র নেতা দেশ থেকে কানাডায় পাড়ি দেন। তবে তিনি দেশ থেকে কানাডায় যাওয়ার পর থেকে ব্যাপক আলোচনা দেখা দেয়। এদিকে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো কানাডায়ও করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পরে। দেশটিতে করোনায় সংক্রমণ ও প্রাণ যাওয়ার ঘটনাও একদম কম নয়। তবে করোনা ভাইরাস দেখা দেওয়ার পর থেকে দেশটি লকডাউন করা সহ নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে আর এর কারণে দেশটিতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ অনেকটা কমে এসেছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমে আসার কারণে দেশটি লকডাউন শিথিল করে। আর এই সময় দেশ থেকে ক্ষমতাসীন দলের এই সিনিয়র নেতা সেই দেশ যান। আর এবার সেই দেশ থেকে তিনি দেশর একটি গমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন।


মাহবুব উল আলম হানিফ: আমার স্ত্রী অসুস্থ, তাই আসতে হয়েছে।
প্রতিবেদক: পত্রিকায় পড়েছিলাম, আপনার বড় ভাই অসুস্থ।

হানিফ: হ্যাঁ, আমার বড় ভাই থাকেন এখানে, আমার পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন অনেকেই কানাডার বিভিন্ন শহরে আছেন। বড় ভাইও অসুস্থ।

বিদেশি নাগরিকের ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কানাডায় এসে আলোচনার জন্ম দেওয়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ মাহবুব উল আলম হানিফের সঙ্গে গত বুধবার দুপুরে (স্থানীয় সময়) হোয়াটসঅ্যাপে এভাবেই কথা শুরু হয়।

১৯ জুন কাতার এয়ারওয়েজে টরন্টোতে এসেছেন তিনি। এই ফ্লাইটে মাহবুব উল আলম হানিফ কীভাবে এলেন, তা নিয়ে বাংলাদেশ ও কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে কৌতূহল ও প্রশ্ন দেখা দেয়। হানিফ কিংবা তাঁর পরিবারের সদস্যদের কেউ কানাডার নাগরিক কিংবা স্থায়ী বাসিন্দা কি না, সেই প্রশ্নও ওঠে।

প্রসঙ্গত, গত ১৬ মার্চ কানাডা সরকার যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া সব বিদেশি নাগরিকের কানাডায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কূটনীতিক, জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং নির্মাণ ও জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন হতে পারে, এমন কর্মীদের এর বাইরে রাখা হয়।

করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে ৮ জুন নতুন ঘোষণায় কানাডার নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের পরিবারের নিকটতম সদস্যদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। পরিবারের নিকটতম সদস্যদের একত্রে মিলিত হওয়ার সুযোগ দিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়েই মাহবুব উল আলম হানিফ কানাডায় আসেন বলে জানা যায়।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, জনাব হানিফের স্ত্রী দুই ছেলে নিয়ে কানাডার ’বেগমপাড়া’ হিসেবে পরিচিত নর্থ ইয়র্কের ’বে ভিউ ভিলেজ’ এলাকায় বসবাস করেন। হানিফ কয়েক মাস পরপরই টরন্টোতে আসেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান। এবারও তিনি বে ভিউ ভিলেজের বাড়িতে বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে আছেন। টরন্টোয় হানিফের বেশ কয়েকটি বাড়ি আছে বলে গুঞ্জন থাকলেও তিনি বরাবরই সেটি উড়িয়ে দিয়েছেন। বে ভিউর বাড়িটি ভাড়া বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেন।

বিদেশি নাগরিকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কানাডায় কীভাবে এলেন, প্রশ্ন করা হয় মাহবুব উল আলম হানিফকে। তিনি জানান, একটা দেশ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট খুলে দিলে আসতে অসুবিধা কী? কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট চলছে, সেই ফ্লাইটে মানুষ আসছে, আসতে তো অসুবিধা নেই।

প্রতিবেদক: বিদেশি নাগরিকেরা এখন কানাডায় আসতে পারছেন না, নিষেধাজ্ঞা আছে। কেবল নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের পরিবারের নিকটতম সদস্যরাই পূর্বানুমতি সাপেক্ষে আসতে পারছেন। আপনি কি এই ক্রাইটেরিয়ায় পড়েন!

হানিফ: সেটা কাতার এয়ারওয়েজকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। আমার মনে হয়, যারা জানে না, তারা এসব কথা বলে। কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট চলছে, আসতে তো কোনো অসুবিধা দেখি না।

মাহবুব উল আলম হানিফ ’কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট চলছে’ বলে দাবি করলেও টরন্টো পিয়ারসন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। পিয়ারসন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের কমিউনিকেশন অ্যান্ড স্টেকহোল্ডার রিলেশনসের সিনিয়র অ্যাডভাইজার রবিন স্মিথ বুধবার ই-মেইলে জানিয়েছেন, কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটটি ছিল বিশেষ ব্যবস্থায় আগে ঠিক করা। টরন্টো পিয়ারসনে কাতার এয়ারওয়েজ এই মুহূর্তে নিয়মিত চলাচলকারী এয়ারলাইনস নয়।

বিদেশি নাগরিকদের কানাডায় ঢুকতে দেওয়া কিংবা দেশ থেকে বের করে দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে গোপনীয়তা আইনের কারণে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিবিশেষের তথ্য নিয়ে আলোচনা করতে তারা অসম্মতি জানায়। পরে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হলে সংস্থাটির গণমাধ্যমের মুখপাত্র জ্যাকুলিন কলিন গত বুধবার এই প্রতিবেদককে জানান, কানাডার নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দাদের মা-বাবা, নির্ভরশীল সন্তান, স্বামী বা স্ত্রী বিদেশি নাগরিক হলেও এই সময়ে কানাডায় ভ্রমণে আসতে পারবেন। তবে তাঁদের সম্পর্কের প্রমাণসহ ইমিগ্রেশন কানাডা থেকে আগাম অনুমতি নিতে হবে। তিনি জানান, কানাডায় আসার পর সিবিএসএ প্রতিনিধি দেখতে চাইলে ভ্রমণকারীকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখাতে হবে।

প্রতিবেদক: আপনার ছেলেরা কি কানাডার নাগরিক? নাকি স্থায়ী বাসিন্দা? আপনার স্ত্রী?

হানিফ: আমি বা আমার পরিবারের কেউই কখনো কানাডায় ইমিগ্রেশনের জন্য আবেদন করিনি। তাহলে সিটিজেন বা স্থায়ী বাসিন্দা কীভাবে হবে। আমার ছেলে গ্র্যাজুয়েশন করছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। মাস্টার্স শেষ হলে তখন হয়তো আবেদন করতে পারে। তবে আমার আত্মীয়দের অনেকেই কানাডার নাগরিক, অনেক বছর ধরে তাঁরা আছেন।

প্রতিবেদক: তাহলে আপনি কীভাবে এলেন? বিদেশি নাগরিকদের ভ্রমণে তো নিষেধাজ্ঞা আছে।

উত্তরে আগের কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন হানিফ।

সিবিএসএর গণমাধ্যমের মুখপাত্র জ্যাকুলিন কলিন তাঁর ই-মেইলে কানাডা সরকারের জারি করা কতগুলো প্রজ্ঞাপনের লিংক সংযুক্ত করেন। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত নিয়মানুসারে, মাহবুব উল আলম হানিফ নিজে কিংবা তাঁর স্ত্রী বা ছেলেরা কানাডার নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা না হলে তিনি এই সময়ে কানাডায় আসতে পারতেন না। স্ত্রী বা ছেলেরা কানাডার নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হলেও তাঁদের কানাডা ইমিগ্রেশনের কাছে আবেদন করে হানিফের ভ্রমণের অনুমতি নিতে হয়েছে। বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাছে পাঠানো বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির বার্তায় স্পষ্ট বলে দেওয়া আছে, কানাডিয়ানদের পরিবারের নিকটতম সদস্য হিসেবে ছাড় পাওয়ার লিখিত অনুমতি না দেখাতে পারলে কাউকে যেন বিমান উঠতে না দেওয়া হয়।

মাহবুব উল আলম হানিফের ভাষ্য অনুসারে তাঁর ছেলেরা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। পরিবারের নিকটতম সদস্যদের ব্যাপারে জারি করা নির্দেশনায় ওয়ার্ক পারমিট ও স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডায় বসবাসকারীদের পরিবারের নিকটতম সদস্যদের আনার সুযোগ দেওয়া হয়নি। হানিফের ছেলেরা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হলে এবং তাঁর স্ত্রীর নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বাসিন্দার স্ট্যাটাস না থাকলে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হানিফের কানাডায় আসার অনুমতি পাওয়ার কথা নয়।

ঢাকার কূটনীতিক সূত্রের তথ্য, মেয়েকে কানাডায় স্কুলে ভর্তি করাতে বছর দুয়েক আগে মাহবুব উল আলম হানিফ পাঁচ বছরের সিঙ্গেল এন্ট্রি (একবার প্রবেশ) ভিসা পেয়েছিলেন। গত বছর ঈদে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আবেদন জানালে তাঁর ভিসাটি মাল্টিপল এন্ট্রিতে (বহুবার প্রবেশে) রূপান্তর করা হয়। ঢাকার তথ্য হচ্ছে, এবার তাঁর স্ত্রী করোনায় কানাডায় আটকে পড়লে তিনি বিশেষ ফ্লাইটে কানাডায় যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন ঢাকায় কানাডিয়ান হাইকমিশন থেকে নিয়মিত ফ্লাইট চালু হলে তাঁকে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পুত্র ও কন্যা তাঁদের বাবার সঙ্গে মিলিত হতে কানাডার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ১৯ জুন কানাডায় গেছেন। তবে কানাডার বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির দেওয়া তথ্য অনুসারে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বা ওয়ার্ক ভিসায় কানাডায় অবস্থানকারীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের অভিভাবক বা পরিবারের কোনো নিকটতম সদস্যের কানাডায় আসার সুযোগ নেই। সূত্র:প্রথম আলো

এদিকে, কানাডায় যাওয়ার পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের এই সিনিয়র নেতাকে বেশ আলোচনা দেখা দেয় আর অনেকর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয় তিনি এই করোনা ভাইরাসের মধ্যে কেন কানাডায় গেলেন। তবে ক্ষমতাসীন দলের এই সিনিয়র নেতা কানাডায় যাওয়ার পর বলেন অতি শিগ্রহী তিনি আবার দেশে ফিরে আসবেন। মূলত তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যারা কানাডায় রয়েছে আর এই কারণে তিনি সেখানে তার পরিবারের সদস্যাএর সাথে দেখা করতে গিয়েছেন। এছাড়া সে দেশ করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কিছুটা কমার কারণে দেশটিতে আরপিত লকডাউন শিথিল করা হয়েছে যার কারণে তার যাওয়ায় কোনো সমস্যা হয়নি।