রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ শনিবার বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ কামাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাদশ সমাবর্তনে বক্তব্য রাখেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ শিক্ষকদের ব্যক্তিগতভাবে তাদের আদর্শ ও নীতিমালা নিয়ে আপস না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "একজন শিক্ষকের অবশ্যই আদর্শ ও সৎ নীতির প্রতীক হতে হবে। একজন চ্যান্সেলর হিসাবে, বর্তমানে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখে আমি হতবাক।" তিনি শিক্ষকদের প্রতি এরুপ কিছু বক্তব্য দেবার পর কিছুটা রসিকতা করেন যার মাধ্যমে তিনি তার ছেলেবেলার স্মৃতিচারন করেন।
’রাজশাহী আসছি, কয়েকদিন পরেই আম পাকার কথা। মনে হয় আইস্যা পড়তাছে। এখানে আমার বাবাজি আমাদের মেয়র সাব, আমার ভাতিজা লিটন এবং আমাদের প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও আছেন। বলে যাচ্ছি আর কি- আমের সিজনে যেন ভালা আম পাঠানো হয়। আম না পাঠাইলে কিন্তু খবর আছে। আম পাঠাইলে যেন আবার ফরমালিন বিষটিষ না থাকে।’

শনিবার রাবির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এভাবেই রসিকতা করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

সমাবর্তনে এসে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। তার স্ত্রী ডলি জোহা আমার সহপাঠী ছিল। আমরা একই স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলাম ১৯৬১ সালে। এরপর আর তাকে দেখি নাই। কিন্তু এই ১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মেয়েসহ বাংলাদেশে এসেছিল। ওই সময় বঙ্গভবনে সে আসছিল। তখন ড. শামসুজ্জোহা সম্পর্কে অনেক স্মৃতিচারণ হয়েছিল।’

একবার এক শিশু চোর বলেছিল, সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মো. আবদুল হামিদ বলেন, ’১৯৭৬ সালে আমি তখন এমএলএ। আমাকে ময়মনসিংহ থেকে প্রথমে কুষ্টিয়া জেলে পাঠায়। এরপর রাজশাহীতে আনা হবে। এক পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, আপনি তো পালাবেন না, তাছাড়া এমএলএ। তাই হ্যান্ডকাফ না লাগিয়ে কোমরে দড়ি না বেঁধেই নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি উকিল হইনি, তবে উকিল হওয়ার পথে। মানে লেখাপড়া শেষের দিকে। আমি মনে মনে ভাবলাম, বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ কয়েদিদের মেরে ফেলেছে। আমি পালানোর চেষ্টা করেছি দাবি করে যদি রাস্তায় গুলি করে মেরে ফেলে, সেজন্য বললাম- না বাবা, আমাকে হ্যান্ডকাফ লাগিয়েই নিয়ে যান। যদি মারার ষড়যন্ত্র থাকে আর কি! তারপর তারা আমার কোমরে দড়ি বেঁধে ফেরিতে তোলে। ফেরিতে আসার পথে আমাকে দেখে সাত বছরের একটি শিশু তার মাকে আস্তে আস্তে বলে- মা, দেখো চুর (চোর)। তার মা শিশুটিকে বলে চুপ করো। আমি পাশ থেকে শিশুর চোর ডাকটি শুনতে পাই। তখন তাকে বলি- তুমি চুর বলো। চুরদেরই এইভাবে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যায়। কোনো অসুবিধা নাই।’

রাজশাহী এবং জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ’শহীদ কামারুজ্জামান আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। তার ডাকনাম হেনা ছিল। আমি হেনা ভাই বলেই ডাকতাম। একজনের বেডে আমরা দু’জন থাকতাম। হেনা ভাই একটু মোটা ছিলেন, আমি চিকন ছিলাম। মাঝে মাঝে ভাই একটু নড়লে আমি নিচে পড়ে যেতাম। তাছাড়া তিনি এমন নাক ডাকতেন, ঘুমানোর উপায় ছিল না।’ রাষ্ট্রপতির এমন রসিকতায় হাসির রোল পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে অনুষ্ঠানে। হাসেন রাষ্ট্রপতি নিজেও।

তিনি ছাত্র এবং শিক্ষকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, শিক্ষকরা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত কর্মকাণ্ডে অংশ না নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন পদ লাভের জন্য তদবির করতে ব্যস্ত রয়েছেন। এটি একজন শিক্ষিত শিক্ষকের কাছ থেকে আশা করা যায় না। একজন শিক্ষক কে এবং তার কী কী গুন থাকা দরকার তা একজন অশিক্ষিত লোকও জানে।

রাষ্ট্রপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে সমাবর্তন অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, অনেক শিক্ষক রয়েছে যারা তাদের ব্যক্তিস্বার্থের জন্য শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন না। শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষকরা তাদের আদর্শ সম্পর্কের কথা ভুলে গিয়েছেন এবং এখন পারস্পরিক স্বার্থের লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক।"

রাষ্ট্রপ্রধান শিক্ষকদের তাদের ভূমিকার কথা এবং মানুষ তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করে তা স্মরণ করিয়ে দেন। জনগণ যেহেতু উচ্চস্তরের সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে শিক্ষকদের দেখেন, তাই তিনি তাদের ব্যক্তিস্বার্থের জন্য তাদের নীতি ও আদর্শের সাথে আপোষ না করার জন্য বলেন।