বাংলাদেশ প্রথম স্যাটেলাইট "বঙ্গবন্ধু-১" মহাকাশে ২০১৮ সালের মে মাসে প্রথম বাণিজ্যিক উপগ্রহ হিসেবে মহাকাশে যাত্রা করায় বাংলাদেশ উপগ্রহ-মালিকানাধীন দেশগুলির মধ্যে অন্যতম সদস্য হয়ে ওঠে। দেশের বিশেষজ্ঞ, নীতি নির্ধারক এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এই উপগ্রহটি ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়াটিকে অতিরিক্ত গতি দেবে যেটা দেড় বছর পরে হলেও বেশ সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে।
দেশে অপ্রত্যাশিত কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটলে, বাংলাদেশ টেলিযোগযোগ ব্যবস্থা যাতে সে তথ্য পেয়ে দ্রুত পেয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে সেটা এই উপগ্রহ পাঠানোর আরেকটি উদ্দেশ্য। প্রাকৃতিক বিপর্যয়কালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগযোগ পরিষেবা পাওয়াও সম্ভব হয় না। এ জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি চলাকালীন স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক দেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগযোগ পরিষেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এটি বাংলাদেশ এবং বঙ্গোপসাগর, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়ার অঞ্চলজুড়ে কু-ব্যান্ড এবং সি-ব্যান্ড পরিষেবা সরবরাহ করে।

এরপর দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ মহাকাশে ২০১৮ সালের মে মাসে যাত্রা করলেও বাণিজ্যিক সেবা দেয়া শুরু করে ২০১৯ সালে। বর্তমানে দেশের সব টেলিভিশন এ স্যাটেলাইট থেকে সেবা গ্রহণ করছে। একটি মোবাইল ফোন অপারেটরসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট থেকে বাণিজ্যক সেবা নিচ্ছে।

দেশের প্রথম এ স্যাটেলাইট থেকে আরও বাণিজ্যিক সেবা দেয়ার সুযোগ আছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিসিএসসিএল সাত প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিকভাবে সেবা দিতে শুরু করে। পরীক্ষামূলকভাবে ছয়টি টেলিভিশন চ্যানেলসহ আরও তিন প্রতিষ্ঠানকে সেবা দেয়।

এসব থেকে গত অর্থবছরের জুন পর্যন্ত তাদের আয় হয়েছে মোট দুই কোটি ৫৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭৩২ টাকা। এ সময়ে স্যাটেলাইট ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে বিসিএসসিএলকে খরচ করতে হয়েছে ১৭ কোটি ৯৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অবশ্য এ টাকা তারা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছ থেকে পেয়েছে।

সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বিসিএসসিএল জানায়, আগের অর্থবছরে সব মিলে তারা মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংকসহ দুই ডিটিএইচ কোম্পানি আকাশ ও বায়ারের কাছে স্যাটেলাইটের ব্যান্ডউইথ এবং ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে আয় করেছেন। তাছাড়া এডিএন ও স্কয়ারসহ আরো দুটি কোম্পানিও বিসিএসসিএল’র কাছ থেকে সেবা নিয়েছে।

গত মে মাসে ছয়টি টেলিভিশন কোম্পানি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সেবা নেয়া শুরু করে। অক্টোবরে এসে সব টেলিভিশন একবারে বাণিজ্যিকভাবে সেবা গ্রহণ করতে শুরু করেছে। আপাতত এগুলোর বাইরে স্যাটেলাইটের আয়ের আর কোনো বন্দোবস্ত হয়নি।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী বছর থেকে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠানকে পরিণিত হবে।

এদিকে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, স্যাটেলাইট আমাদের স্বপ্নের জিনিস। পৃথিবীর ৫৭তম স্যাটেলাইট উেক্ষপণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গর্বিত। বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক উচ্চ প্রযুক্তির এই স্যাটেলাইট আমাদের সন্তানরাই নিখুঁতভাবে পরিচালনা করছে। এটাও বাঙালির আরো একটি গর্বের জায়গা।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালের মধ্যে আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণ করার কার্যক্রম শুরু করেছি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ কি ধরনের স্যাটেলাইট হবে সেটাও নির্ধারণ করার বিষয়টি জরুরি। তিনি এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।

এটিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ২০২৩ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধু-২ উৎক্ষেপণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন।

উল্লেখ্য, উন্নত টেলিযোগাযোগ পরিষেবা নিশ্চিত করতে বিটিআরসি সর্বদা নিজস্ব উপগ্রহ নেটওয়ার্কের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল। দেশের প্রথম উপগ্রহ থাকার এটি দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য, বিটিআরসি ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে একটি কমিটি গঠন করে যা এরপরে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে সংস্কার করা হয়। এরপর আরো কিছু প্রক্রিয়া সম্পাদন করা হয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য।

স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডারকে অন্যান্য দেশে বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং নিজেদের অর্থ নিজেদের কাছে রাখার জন্য সরকারের পরিকল্পনা ছিল। আমাদের দেশে যে সকল টেলিভিশন চ্যানেলগুলি রয়েছে সেগুলো এখন অন্যদের উপগ্রহের কাছ থেকে সেবার গ্রহনের জন্য বিশেষত সম্প্রচারের জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না। বর্তমানে দেশে ৩৭ টি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে এবং এ গুলোর জন্য প্রতি বছর অ্যাপস্টার-৭ এবং এশিয়া সেট উপগ্রহ ব্যবহারের জন্য প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হতো, তা এখন করতে হয় না।