গত ১৭ই নভেম্বর ২০১৯ থেকে সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর এবং প্রয়োগ শুরু করেন ’বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা’ বিআরটিএ, কিন্তু সংসদে আইনটি পাশ হয়েছিল একবছরের বেশি সময় আগে। আইনটি প্রয়োগ হয়েছিল কিন্তু গাড়ি চালক এবং গাড়ির মালিকদের এই আইন সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ধারনা দেবার জন্য ১৫ দিন সময় যোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু বাড়তি দিনগুলো পার হবার পরই পরই সড়ক আইন বাতিলের দাবিতে পরিবহন শ্রমিকরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কই নয়, দেশের অনেক জেলাতে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়। ফলে নানারকম যানযট ও চলাচলে বিঘ্নসহ বিপাকে পড়ে সাধারন মানুষ। তারা দাবি করেন এই আইন তাদের জন্য কঠোর হয়ে গেছে যার কারনে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। তারা প্রনীত আইন সংশোধনের দাবি জানান। শ্রমিকদের একটি বিশেষ সূত্র জানায়, পরিবহন শ্রমিক আইনের ১২৬টি ধারার মধ্যে ৯টি ধারার প্রতি আপত্তি জানান তারা।
শ্রমিকরা বুধবার থেকে সড়ক অবরোধ শুরু করে এবং যানবাহন চলাচল পুরোপুরি অচল করে দেয়। ৩৩টি জেলায় কোন ধরণের পরিবহন চলাচল করতে দেয়া হয়নি। ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যানেও কোন পণ্য পরিবহন হয়নি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় সড়কে সড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন পরিবহন শ্রমিকরা। রাস্তায় গাড়ি বের করলেও ড্রাইভারের মুখে কালি লেপন ও মারধর করেন। রাস্তায় গাড়ি বের করলে ভাঙচুর করেছেন পরিবহন শ্রমিকের কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবকেরা। মাঝপথে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে কোথাও কোথাও। সবমিলিয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে দিন পার করেন যাত্রীরা। ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল ছিল স্বাভাবিক।যেহেতু সড়ক পরিবহন বন্ধ, তাই ট্রেন ও লঞ্চে ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভীড়।এত ভীড়েও যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম সড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় অবরোধ করে যান চলাচলে বাঁধা দেন শ্রমিকরা। অবরোধের কারণে আটকা পড়ে হাজার হাজার মানুষ। এছাড়া সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, টঙ্গী, ঢাকার আশুলিয়াসহ কয়েকটি স্থানে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখলাখ মানুষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।বিশেষ করে পিইসি পরীক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়ে। কেউ কেউ বিকল্প উপায়ে তিনচারগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছেছেন।শ্রমিকদের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে পণ্য আমদানি-রপ্তানি গাড়ির কার্যক্রমে প্রভাব পড়ায় কাঁচা তরিতরকারি ও শাকসবজির দাম বেড়ে যায়। জনমনে শুরু হয় বিব্রতকর ভোগান্তি। একদিকে সড়ক অবরোধ, বিশৃঙ্খলা অন্যদিকে তারই প্রভাব নিত্যপণ্যে।

এদিকে বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি)র হিসাব অনুযায়ী সারাদেশে গাড়ির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে ৩৮ লাখ। তারমধ্যে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি গাড়ি ফিটনেসবিহীন। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন মাত্র সাড়ে ২২ লাখ চালক। অবৈধ চালকের সংখ্যার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে তা ১০ লাখের কম নয়। ঘুষ বা দুর্নীতি করে ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলির রুট পারমিট দেওয়ার অভিযোগ আছে সংস্থাটির। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ি। দুর্ঘটনার পর জনগণ ফুঁসে উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে কিন্তু কিছুদিন পরেই আবার তা স্তিমিত হয়ে যায়।সড়কে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটে। বুয়েটের এআরআই এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৫১৩টি। তারমধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৭৬ জনের। এ পর্যন্ত দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িগুলি যাচাই করে দেখা গেছে প্রায় প্রত্যেকটি গাড়িই ফিটনেসবিহীন এবং ভারি যান চলাচলের জন্য তাদের রুট পারমিট ছিল না। তাছাড়া কে কার আগে যাবে এটা নিয়েও চলে ড্রাইভারদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগীতা।মাঝেমাঝে মাতাল অবস্থায়ও গাড়ি চালান ড্রাইভাররা এমন অভিযোগও আছে। ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি যাত্রী তোলা এবং যত্রতত্র বিশৃঙ্খলভাবে নামাতে গিয়েও দুর্ঘটনা ঘটে প্রায়ই। অদক্ষ ড্রাইভার ও জনগণের অসচেতনতার ফলে সড়কে দিনদিন বেড়েই চলেছে মৃত্যুর মিছিল।

নতুন আইনের আওতায় যে যেভাবে পুরোনো লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন সে লাইসেন্স দিয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত গাড়ি চালাতে পারবেন।অর্থাৎ ৭ মাস পর নতুন করে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে।এবং সঠিক লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাতে হবে।

গাড়ির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নিয়ে শ্রমিকরা কিছু দাবি তুলেছেন তা বিআরটিএ জুনের মধ্যে বসে একটি সমাধান করবেন।বিদ্যমান লাইসেন্স নিয়ে বিআরটিএ এর কাছে গেলে বিআরটিএ সেগুলোর ক্যাটাগরি ঠিক করে দেবেন।অবৈধ লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালালে সেগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খতিয়ে দেখা উচিৎ।সড়কে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তা নিরসনে নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকাসহ সারাদেশে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে একের পর মিটিং,সুপারিশ করেও কোন ফায়দা করতে পারছেন না। অতীতেও অনেকবার সড়ক আইন করা হয়েছে কিন্তু তা শ্রমিক ও মালিক সমিতির অসহযোগীতার কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষত্রে বলা যায় আমাদের অবকাঠামো,প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক ক্ষমতার অভাব রয়েছে। যার ফলে আগের আইনটি পুরোপুরি প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। নতুন আইনটি আগের তুলনায় দশগুণ কঠোর।তাই নতুন আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো,প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপক জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন ’নতুন আইন সঠিকভাবে পালন করলে দুর্ঘটনা কমবে’।তিনি বলেন সড়ক পরিবহন মালিক- শ্রমিকনেতাসহ সকলের মতামতের ভিত্তিতে এই আইন প্রণয়ন করা হয়।যুগোপযোগী এই আইনটি পাশ হওয়ার পর ক্ষতির আশংকা করে আগেই ভয় পেয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চারদিকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে তা খুবই দুংখজনক।এবং এমন অস্থিতিশীল পরিবেশ দেশের কোন সচেতন নাগরিক হিসেবে কারো কাম্য নয়।

নতুন আইন অনুসারে, ড্রাইভিং লাইসেন্সে ১২ পয়েন্ট থাকবে। একজন ড্রাইভার প্রতিটি অপরাধের জন্য একটি পয়েন্ট হারাবে। কোনও ড্রাইভারের লাইসেন্স বাতিল করা হবে যদি তারা সিট বেল্ট ব্যবহার না করা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা, রাস্তার সঠিক পাশ দিয়ে গাড়ি না চালানো, বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং যাত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা এবং সঠিক স্থানে যানবাহন পার্ক না করার মতো অপরাধ করার জন্য সমস্ত ১২ পয়েন্ট হারিয়ে ফেলবে।

পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হওয়ার কথা থাকলেও এটি চালকদের গ্রহন করতে অনেক সময় লাগবে। ড্রাইভিং নিয়ন্ত্রণে চালকদের উপর কার্যকরীভাবে ডোপ পরীক্ষা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তারও আধিকারিকদের অভাব রয়েছে, যার ফলে আইন প্রয়োগ হবে সময় সাপেক্ষ। সড়কপথকে একটি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার না করলেও পরোক্ষভাবে পরিবহন সেক্টরে প্রভাব বিস্তার করে থাকে যার মাধ্যমে তারা রেল কিংবা পানিপথের মত পরিবহন মাধ্যম বা খাতে বিভিন্নভাবে অসংগতি তৈরি করে, ফলে মানুষের মনে একটা ভূল ধারনা বা পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিআরটিএ এর যে শাখা গাড়ী এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করে থাকে, সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবনতামুক্ত হতে হবে। জাল বা নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স কোনোভাবেই যেন চালকরা ব্যবহার করতে না পরে সে দিকে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে। যে সকল গাড়ির লাইসেন্স নেই সে সকল গাড়ি এবং চালকদের গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে।