সর্বশেষ যেদিন খোকা ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল সেটা প্রায় মাস খানেক আগের কথা। তাঁর ক্যান্সারে নিষ্পেষিত মলিন চেহারাতে সেদিন তার সতেজতা-প্রাণবন্ততা দেখে বলেছিলাম, "কে বলেছে আপনার অসুখ করেছে, আপনার তো কোনো অসুখ বিসুখই নেই। আপনি তো দিব্যি সুস্থ হয়ে গেছেন খোকা ভাই।’ তাঁর চিরায়ত অনেকটা নিষ্পাপ শিশুদের মত নিজের মুখে হাত বুলিয়ে মুচকি হেসে বলেছিলেন, তুমি সত্যিই বলতেছো তো? ’জ্বি খোকা ভাই, একদম ঠিক।
এর আগে নিউ ইয়র্কে যে কবার দেখেছি, আপনাকে দেখে মন খারাপ হয়ে যেতো, অচেনা লাগতো। এইবার একদম আগের মতো লাগছে-আগের মতোই জাঁদরেল। কিন্ত মাস খানেকের মধ্যেই তিনি চলে যাবেন সে ভাবনা আসেনি একবারের জন্যও।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর বছর তিনেক আগে নিউইয়র্কে তাকে দেখে আমি চমকে গেছিলাম, প্রতাপশালী একজন মানুষ কতটা গুটিয়ে যেতে পারেন, সার্বক্ষণিক জনমানুষ পরিবেষ্ঠিত একজন কতটা নির্জনে থাকতে পারেন খোকা ভাই তার প্রমাণ। আমার সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, তোমার বিয়েতে গেছিলাম। আমি আরেক ধাপ এগিয়ে বলতাম- ’শ্বশুর বাড়ির লোকদের মশার কামড় থেকে বাঁচাতে দু’একবার বাসার আশপাশে মশা মারার ওষুধও দিতে হয়েছে।’ খোকা ভাই হাসতেন!

মাত্র ১০/১৫ বছর আগেও বাংলাদেশের রাজনীতি এতোটা অসহনশীল ছিলো না, এখন যতটা বোধ করি। ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং পেশাদারিত্ব দুটোই সমানে সমান চলতে পারতো। এক যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের অনিয়ম সংক্রান্ত যে পরিমাণ রিপোর্ট আমি করেছি কিংবা হাতির ঝিল প্রকল্পটিকে পরিবেশ বান্ধব রাখতে ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে যতটা তটস্থ রেখেছি, তা কি এখন পারতাম? পারলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কটি কি থাকতো? কিংবা এখন যত উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে তাতে অনিয়মের খবর সাংবাদিকরা কতটা তুলে ধরতে পারছেন? খোকা ভাইর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরছে।

জামায়াত ঘেষা বিএনপি’র রাজনীতির সঙ্গে খোকা ভাইয়ের রাজনৈতিক দর্শনে ভিন্নতা ছিলো। মান্নান ভূইয়া, সাদেক হোসেন খোকা যে ধারায় বিএনপি’র রাজনীতি পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন, দলটির হাইকমান্ড সে ধারায় অগ্রসর না হওয়ায় তার মাসুল গুনছে বিএনপি। একজন বীর মুক্তিযাদ্ধা হয়েও খোকা ভাইকে থাকতে হয়েছে পরবাসে। সে শুধুই ভিন্ন মতের জন্য নয়, কিংবা মামলা হামলার ভয়ে নয়, নয় শারীরিক অসুস্থতা। সাদেক হোসেন খোকা সাহসী মানুষ ছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। সেই যুদ্ধের তার হাতের একটি আঙ্গুল পুরোপুরি উড়ে গিয়েছিল, তিনি থেমে থাকেননি সেই যন্ত্রনায়, কারন এটি ছিল সমরাঙ্গন। যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন সেই যন্ত্রনাকে পরোয়া না করে। সাদেক হোসেন খোকা দুর্ধর্ষ ক্রাকপ্লাটুনের একজন সদস্য হওয়ার পরবর্তী জীবনে যোগ দেন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবেও যেখানে তিনি একজন যোদ্ধার মতই সাহসিকতা দেখিয়েছেন বেশ কয়েকবার। দল থেকে নিজেকে স্তিমিত করে সরিয়ে নেন কারনটিও কিছুটা আফসোসের। অভিজ্ঞ নেতারা যখন দলের কোনো সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামতের কদর হারায়, তখন তাদের জন্য পরবাসই শ্রেয়। সেই সব ব্যস্ততা, মান অভিমান, কৌশলীতা, নির্জনতা সব আয়োজনের উর্ধ্বের একজন এখন সাদেক হোসেন খোকা। তিনি এখন শুধুমাত্র মহান মানুষদের মত কেবল ইতিহাসের একটি অংশ। মহাকালে হারিয়ে যাওয়া সেই ভাইয়ের প্রতি অনেক শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।