প্রত্যেক রাষ্ট্র মুলত: কয়েকটি প্রশাসনিক কাঠামো দ্বারা পরিচালিত হয়। সেই ভিত্তিতে বাংলাদেশের রয়েছে রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক কাঠামো যার চারটা মূল অংশ আছে। এই চারটি প্রশাসনিক কাঠামোর সবার ওপরে আছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কোনো ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান্তর তাদেরকে সামান্যতম স্পর্শ করে না। এসব অবস্থান্তর বা পরিবর্তন থেকে তারা আলাদা থাকে। এরপর রয়েছে ব্যবসায়ীরা। তারপর বিভিন্ন স্তরের আমলারা এবং সবশেষে আছে যারা রাজনীতি করেন অর্থাৎ রাজনীতিকরা। এই চারটি প্রশাসনিক কাঠামোর সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো রাজনীতিকরা। কারণ সমর্থনকারী দলের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে তাদের ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়া।

অল্প কয়েক দিন পূর্বে ক্যাসিনোতে যে র‍্যাবের অভিযান হলো, সে প্রসঙ্গে টেনেই বলছি। তারা বেশ আরামেই ব্যবসা করে গেছে তত দিন পর্যন্ত যত দিন পর্যন্ত তাদের দিকে পুলিশ বা র‌্যাব নজর দেয়নি। আর যখনই তাকাল, তারা এবং তাদের এই বানিজ্য শেষ হয়ে গেল। তাহলে একটু ভেবে বলুন তো সবচেয়ে দুর্বল অংশ কোনটা? রাজনীতিকদের এই অংশটা। এটা কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা দেখে বলতে পারি না যে আজকেই এটি প্রথম হচ্ছে।

গ্রেফতার হওয়া খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া হচ্ছেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক। এই নেতার বসবাস গুলশানে এবং এটাও জানা যায় যে তার প্রকাশ্য কোনো ধরনের ব্যবসা নেই। পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেল তার সম্পদের সবচেয়ে বড় উৎস চাঁদাবাজি। রাজনীতিবিদের একটা গতানুগতিক ধারণা রয়েছে, আর তা হলো তাদের দল ক্ষমতাসীন তাই তাদের এই ধরনের কর্মকান্ডে কোনো প্রকার অসুবিধা হবে না। কিন্তু সম্প্রতি ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী অনেকটাই প্রমাণ করলেন যে, এই সব স্বার্থপর এবং আখের গোছানো নেতা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী চলতে পারেন এবং পারবেন। এ রকম অবস্থা সৃষ্টি হলে সবার সেই সময়টাকে একটু সামলে পার করা উচিত।

যারা দলীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে এসব অন্যায় কাজে লিপ্ত হলো, তারা হয়তো ভেবেছিলেন প্রধানমন্ত্রী এসব নিয়ে কিছু বলবেন না। তারা কী করে ভাবলেন তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রতি প্রধানমন্ত্রী অনুগত? কী করে ভাবলেন প্রধানমন্ত্রী এগুলো জানার পর সব মেনে নেবেন? প্রধানমন্ত্রী দলের সভাপতি হতে পারেন, কিন্তু তিনি তো প্রধানমন্ত্রী। তিনি তো শুধু আওয়ামী লীগের নন, সারা দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাকে সব সামলাতে হয়।

একটা বিষয়ে আমরা বিস্মিত হয়েছি যে, এই ক্যাসিনোগুলো থানার কাছাকাছি। তাহলে পুলিশ তো নিশ্চয়ই জানত। সাংবাদিকতায় আমার ৪৫ বছর হয়েছে। আজ পর্যন্ত একটা ঘটনাও দেখিনি যেটা পুলিশ জানে না। সেটাই যদি হয় তাহলে পুলিশ নিশ্চয়ই জানত। আমার ৬৭ বছর বয়স। সত্যি বলতে কি আমি নিজেও জানতাম না যে, ঢাকায় ক্যাসিনো আছে। কিন্তু অনেকে দেখি জানত। তাহলে আমার মতো মানুষের সংখ্যা নিশ্চয়ই কম।

প্রশ্ন হলো, এগুলো এত দিন চলতে দেওয়া হলো কেন? নিশ্চয়ই রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বলে। যদি রাজনৈতিক প্রভাব থাকে তাহলে পৃষ্ঠপোষকও ছিল। একটা খবর এসেছে, যুবলীগের অনেকেই এটা থেকে ভাগ পেত। তাই যদি হয় তাহলে যুবলীগ এটা করতে গেল কেন? পুলিশ চোখ উল্টেছে। তারা সব সময়ই এটা করে। এই অভিযান কিন্তু র‌্যাব করেছে। তাহলে এটা সু-স্পষ্ট যে শুধু পুলিশের ওপর সরকার নির্ভর করেনি। কারন তাদেরও কিছু কেলেন্কারী আছে। তাই সরকার নির্ভর করেছে র‌্যাবের ওপর।

২০১৮ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তারপর পুলিশের ওপর বেশ কয়েকবার আঘাত এসেছে। পুলিশ একটি গুরুতর ভুল করবে যদি তারা ভেবে থাকে যে সরকার সবসময় তাদের ওপর নির্ভর করছে। যিনি অভিযোগের প্রেক্ষিতে ডিআইজিকে যদি জেলে ঢোকাতে পারেন, তবে এটা ও ভাবা উচিত তিনি অনেক কিছুই করতে পারেন। দলের স্বার্থপর লোকেরা বোধহয় এতটা ভাবেনি।

সরকার দলীয় এই দলটির ওপর কোনো না কোনোভাবে চাপ তৈরি হয়েছে। আগে সরকার হিসেবে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখনও কমবেশি অনেক নেতাই তো একই কাজ করতো। এটা রাজনীতিতে থাকবেই যেটা একটা স্বাভাবিক বিষয়। আর একটা রাজনৈতিক দল তখনই শুদ্ধি অভিযানে যায়, যখন তারা অনুভব করে যে তাদের অসুবিধা হচ্ছে। এটা স্পষ্ট নয় যে, আওয়ামী লীগের ওপর কোনো কারণে চাপ তৈরি হয়েছে কি না। একটা ক্ষমতাসীন দলের যখন কোনো বিরোধী দল থাকে না এবং বিশালভাবে জয়ী বা ক্ষমতাবান হয়, তখন ঐ দলের ভিতরেই বিরোধী দল তৈরি হয়। যেটার দিকে এই দলটি গুটি গুটি পায়ে এগুচ্ছে।

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ