বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনা ভাইরাস এখনো দান্ডপ চলছে আর দেশে দেশে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষ করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের অধিক। এছাড়া এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখের অধিক মানুষের প্রাণ গেছে। আর বর্তমানে সারা বিশ্বের মানুষ কার্যকরী ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক পাওয়ার আশায় রয়েছে। আর সারা বিশ্বের মানুষ অপেক্ষায় রয়েছে কবে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে সুখবর দিবে। তবে এর মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এ কারণে করোনায় প্রাণ যাওয়া কিছুটা হলেও কমেছে। এছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাসের নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য জানতে পারছে।


ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে যখন করোনার সংক্রমণে রোগীরা কষ্টের শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছিলেন, তখন বিশ্বের বড় বড় চিকিৎসক মা’রাত্মক শ্বা’সকষ্ট কমানোর জন্য রোগীকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা করছিলেন। ছিল না কোনো ওষুধ। এখন তারা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের সাহায্যে চিকিৎসা করে রোগীদের কষ্ট কমানোর পাশাপাশি মৃ’’ত্যুহার কম করতেও সফল হয়েছেন।

টেক্সাস মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন কভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যাপারে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা জানিয়েছেন।

১. মার্চ-এপ্রিলে কভিড-১৯ ভাইরাসে রোগীর মা’রাত্মক শ্বা’সকষ্ট ও কিছু ক্ষেত্রে মৃ’’ত্যুর কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছিল শ্বা’সনালীসহ ফু’সফুসের জটিল সংক্রমণকে। ওই সময় রোগীদের কষ্ট কমাতে ও প্রাণ বাঁচাতে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা জেনেছেন, ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে শ্বাসনালী ও ফুসফুসে
সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে ফু’সফুসের সূক্ষ্ম র’ক্তনালীতে র’ক্তের জমাট অংশ বা ডেলা তৈরি করে। এর ফলে শরীরে অক্সিজেন সমৃদ্ধ র’ক্ত চলাচল করতে পারে না।

২. শরীরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়ায় শ্বা’সকষ্ট বাড়ে। এই কারণে কভিড রোগীর শ্বা’সকষ্ট কমাতে র’ক্ত পাতলা করার ওষুধ অ্যাসপিরিন ও হেপারিন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ভারতের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামী জানান, কভিড আক্রান্ত রোগীদের মাইক্রোভাস্কুলার ব্লাড ক্লট হচ্ছে। অর্থাৎ খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম রক্তনালীতে রক্তের ডেলা আটকে যাওয়ায় রোগীদের মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হয়। ব্যাপারটাকে হার্টের ইস্কিমিয়ার সঙ্গে তুলনা করা চলে। রক্ত জমাট বাঁধা আটকাতে ব্লাড থিনার জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানালেন এই চিকিৎসক।

৩. কভিড-১৯ আক্রান্তদের প্রধান সমস্যা শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া। এই ভাইরাস শরীরে গেলেই যে মা’রাত্মক শ্বা’সকষ্ট শুরু হবে তা নয়, বললেন মেডিসিনের চিকিৎসক দীপঙ্কর সরকার। তবে হাইপারটেনশন, ফু’সফুসের ক্রনিক অসুখ, ডায়াবেটিস বা হার্টের অসুখের মতো অসুখ থাকলে রোগীদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণত শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ ৯০ শতাংশের থেকে কমে গেলে শ্বা’সকষ্ট শুরু হতে পারে। তাই করোনা আক্রান্তের বিশেষ কোনো শারীরিক উপসর্গ না থাকলে রোগীকে বাড়িতে আলাদা রেখে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। তবে রোগীর অন্যান্য শারীরিক উপসর্গের উপর খেয়াল রাখতে হবে। পালস অক্সিমিটারের সাহায্যে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা মাপতে হবে। যদি অক্সিজেনের মাত্রা ৯৩ শতাংশ বা তার থেকে কম হয় তাহলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করে ব্লাড থিনার ও দরকার হলে অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।

৪. ওষুধ প্রসঙ্গে দীপঙ্কর সরকার জানালেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাস ঘটিত অসুখে ওষুধের ব্যবহার সীমিত। কেননা ডেঙ্গু বা অন্যান্য ভাইরাস ঘটিত অসুখ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেলফ লিমিটিং। কিন্তু কভিড-১৯ যে শুধু চট করে সারে না তা নয়, মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। এই কারণেই ওষুধ নিয়ে সবাই চিন্তিত। কিছু কিছু ওষুধ যা ভাইরাস ঘটিত অসুখের জন্য তৈরি করা হয়েছিল সেগুলোই করোনা রোগীদের উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে এগুলো যে করোনার জন্যই আবিষ্কার করা হয়েছে তা কিন্তু নয়। রেমডেসিভির ওষুধটি ইবোলার জন্য বানানো হয়েছিল আর ফ্ল্যাভিপিরাভির মূলত ইনফ্লুয়েঞ্জার ওষুধ। করোনার চিকিৎসায় এই দু’টি ওষুধ ব্যবহার করে ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে।

৫. করোনা আক্রান্ত রোগীদের মৃ’’ত্যুর কারণ শুধুই যে কভিড-১৯ ভাইরাস তা কিন্তু নয়। অনেক সময় রোগীর শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাইটোকাইন স্ট্রম তৈরি করায় রোগী মারা যান। এ ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ব্যবহার করে ভাল ফল পাওয়া যায়।

৬. কভিড-১৯ আক্রান্তের শ্বা’সকষ্ট ও নিউমোনিয়া হলে ভেন্টিলেশন দেওয়ার সময় প্রন পোজিশন, অর্থাৎ রোগীকে উল্টো করে শুইয়ে চিকিৎসা করা হলে রোগী দ্রুত আরাম পান। তাই করোনার রোগীদের প্রন পজিশনে ভেন্টিলেশন দেওয়া উচিত। স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের ফু’সফুসের কিছু অংশ কম কাজ করে, আমরা বলি ডিপেন্ডেন্ট পার্ট অব লাংস। যখন দাঁড়িয়ে থাকি, তখন ফু’সফুসের নীচের অংশ এবং যখন সোজা হয়ে শুয়ে থাকি তখন ফু’সফুসের পিঠের দিকের অংশে অপ্রয়োজনীয় জিনিস থিতিয়ে পড়ায় কর্মক্ষমতা তুলনামূলক ভাবে কম থাকে। রোগীকে সোজা করে শুইয়ে ভেন্টিলেশন দিলে অক্সিজেন ও ওষুধ ফু’সফুসের পেছনের অংশে পৌঁছায় না। উল্টো দিক করে শুইয়ে ভেন্টিলেশন দিলে রোগীর ফু’সফুসের পেছনের অংশে ওষুধ ও অক্সিজেন পৌঁছে যায়। ফলে কষ্ট কমে ও রোগী দ্রুত সুস্থ হওয়ার দিকে এগিয়ে যান।

তবে কভিড-১৯ প্রতিরোধের দিকে বেশি জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা। এই জন্য মানুষে মানুষে অন্তত ৬ ফুট দূরত্ব রক্ষা করার পাশাপাশি হাত সাবান দিয়ে ধোওয়া, নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরা, ভিড়ের জায়গা এড়িয়ে চলা ও অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে না যাওয়ার নিয়ম কঠোর ভাবে মেনে চলতে পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। সূত্র- আনন্দবাজার।

এদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সাথে সাথে অনেকে এখন সুস্থ হয়ে উঠছে। তবে প্রথম দিকে করোনা ভাইরাসের যে লক্ষণ গুলো দেখা যেত তার পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেক মানুষের বর্তমানে করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা না দিলেও তারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। আর এ কারণে বর্তমানে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ব্যাপক চিন্তার মধ্যে রয়েছে। তবে করোনা ভাইরাসের এই সকল ওষুধের মাধ্যমে অনেকে সুস্থ হয়ে উঠছে বলে দাবি করছে চিকিৎসকরা। আর করোনা ভাইরাসের কার্যকরী ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক না আসা পর্যন্ত সকল মানুষদের অধিক সচেতন থাকতে বলা হচ্ছে।