দেশে করোনা ভাইরাস দেখা দেওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য খাতের সরঞ্জাম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ একদমই কমছে না। একের পর এক অভিযোগ উঠে আসছে এই করোনা সুরক্ষার সরঞ্জাম নিয়ে। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠান এই করোনার সরঞ্জাম দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরও তারা সেই সকল দায়িত্ব সঠিক ভাবে পাল করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া করোনার সরঞ্জাম তৈরি করার জন্য টাকা নিয়েও তা ঠিক সময় সরবারহ করতে পারছে না। আর এই সকল অভিযোগ ওঠার পরও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোনো সদুত্তর দিতে পারছে না। আর এবার এমনি একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় রকমের অভিযোগ উঠে এসেছে। করোনার সরঞ্জাম তৈরি করার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি তা সঠিক সময়ে সরবারহ করতে পারছে না।


অটোমোবাইল কোম্পানি, অথচ দায়িত্ব পেয়েছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহের। সেই কোম্পানির ঠিকানায় অবশ্য কোনো কার্যালয়ের অস্তিত্ব নেই। চুক্তি অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে সরবরাহ করার কথা ছিল পিপিই-মাস্ক-গ্লাভস। ৮৪ দিন পর্যন্ত একটি পণ্যও সরবরাহ করেনি জাদিদ অটোমোবাইলস নামে সেই কোম্পানি। অথচ ঠিকই ৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে কোম্পানিটি। এসব বিষয়ে জাদিদের মালিক যেমন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি, তেমনি প্রকল্প কর্মকর্তাদের কাছেও মেলেনি এ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর।
নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে অনুমোদন পায় ’কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স আন্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি)’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ— ৮৫০ কোটি টাকা অর্থায়ান করছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রকল্পেই ৩১ কোটি ৯০ লাখ টাকার পিপিই সরবরাহের কাজ পায় জাদিদ অটোমোবাইলস।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯ মে ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় জাদিদ অটোমোবাইল নামের প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয় সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের। চুক্তিনামা অনুযায়ী ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় জরুরি ভিত্তিতে ৫০ হাজার পিস কাভারঅল পিপিই, ৫০ হাজার পিস কেএন-৯৫ মাস্ক, ৫০ হাজার পিস এন-৯৫ মাস্ক ও এক লাখ পিস হ্যান্ড গ্লাভস সরবরাহের অনুমতি পায় জাদিদ অটোমোবাইলস। এর জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল ৪৫ দিন। তবে ২৮ জুলাই পর্যন্ত ৮৪ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো একটি সুরক্ষা সরঞ্জামও সরবরাহ করতে পারেনি বলে জানা গেছে। অথচ ৩০ জুনের আগেই জাদিদ অটোমোবাইলস প্রকল্প থেকে সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের ৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা তুলেও নিয়েছে!
অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে প্রতিবেদকের কাছে চুক্তিনামার একটি নথি আসে। বেশকিছু অসঙ্গতি দেখা যায় এই চুক্তিনামায়। এতে জাদিদ অটোমোবাইলসের ৫০ হাজার পিস কাভারঅল পিপিই সরবরাহের কথা থাকলেও সেটি কোন লেভেলের হবে, তা উল্লেখ নেই। অথচ স্বাস্থ্য খাতের সব প্রকল্পেরই পিপিই সরবরাহের ক্ষেত্রে মানের বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ থাকে।
চুক্তিনামায় জাদিদের সঙ্গে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন অংশেও অসঙ্গতি দেখা যায়। যেমন— বলা হয়েছে, চুক্তি সইয়ের পর ১৫ দিনের মধ্যে আগাম অর্থ দেওয়া হবে জাদিদকে। এর পরিমাণ কথায় লেখা আছে ২০ শতাংশ, অঙ্কে ৩০ শতাংশ। আবার পণ্য সরবরাহ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে মূল্য পরিশোধের কথা বলা আছে কথায় ৭০ শতাংশ, অঙ্কে ৬০ শতাংশ। চুক্তিনামায় প্রকল্প পরিচালকের নামও উল্লেখ করা হয়নি।
সূত্র বলছে, এই চুক্তিনামার ভিত্তিতেই জাদিদ সাড়ে ৯ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে সুরক্ষা সরঞ্জামগুলো সরবরাহের জন্য। তবে চুক্তি অনুযায়ী ৪৫ দিন তো দূরের কথা, ৮৪ দিনেও তারা একটি পণ্যও সরবরাহ করতে পারেনি।
তবে ১৪ এপ্রিল জাদিদ অটোমোবাইলসের মালিক শামীমুজ্জামান কাঞ্চন গণমাধ্যমকে দাবি করেন, ৭০ শতাংশের মতো পিপিই তারা সরবরাহ করেছেন। তবে এসব পণ্য কোথায় সরবরাহ করা হয়েছে— সে প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্টোর সূত্রও জানাচ্ছে, এই প্রকল্পের আওতায় কোনো নিরাপত্তা সুরক্ষা সামগ্রী তারা বুঝে পাননি। তবে মজার বিষয় হলো— এসব পিপিই স্বাস্থ্য অধিদফতরের পণ্য মজুতের তালিকায় এরই মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পণ্য বুঝে না পেয়েও কিভাবে ওয়েবসাইটে এন্ট্রি দেওয়া হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে প্রকল্পের স্টোর কর্মকর্তা মীর্জা মাসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ’আমাকে স্যাররা বলেছেন। তাই এন্ট্রি দিয়েছি। কিন্তু কোনো পিপিই আমি পাইনি।’
অন্যদিকে, পিপিই-গ্লাভস বা মাস্ক সরবরাহ না করতে পারলেও সাড়ে ৯ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সাক্ষাতে কথা বলার আগ্রহের কথা জানান কাঞ্চন। তিনি পরে বলেন, কাগজপত্রে কিছু ত্রুটি আছে। সেগুলো সংশোধন করে যোগাযোগ করবেন। পরদিন ১৫ ‍জুলাই ফের তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। পরে ২৮ জুলাই পর্যন্ত দফায় দফায় তার মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাফল্য মেলেনি।
সুরক্ষা সরঞ্জামের বাড়তি দাম
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জরুরিভিত্তিতে কেনাকাটার জন্য ডিপিএম (সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি) পদ্ধতিতে জাদিদ অটোমোবাইলসকে কাজ দেওয়া হয়েছে। তারা ইআরপিপি প্রকল্পের জন্য একেকটি কাভারঅল পিপিই’র দাম ধরেছে ৩ হা ৯শ টাকা। যদিও কেন্দ্রীয় ওষুধাগার সূত্র বলছে, দেশে দুই হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২২শ টাকায় লেভেল-৩ পিপিই পাওয়া যাচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। বর্তমানে বাজারে ২০০ টাকা পর্যন্ত দামের কেএন-৯৫ মাস্ক পাওয়া যায়। কিন্তু জাদিদের যে দেড় লাভ কেএন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করার কথা, তার একেকটির দাম ধরা হয়েছে ৫২০ টাকা করে। একইভাবে তারা এন৯৫ মাস্কের দাম ধরেছে ৮৫০ টাকা, হ্যান্ড গ্লাভস ৩৫ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর অর্ধেক দামেই অনেক ভালো পণ্য বাজার থেকে কেনা সম্ভব।
করোনাভাইরাসজনিত মহামারি পরিস্থিতিতেও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলা প্রকল্পে এমন অসঙ্গতিপূর্ণ চুক্তিকে ’সাগর চুরি’ হিসেবে অভিহিত করছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।সূত্র:সারাবাংলার

উল্লেখ্য, দেশে করোনা ভাইরাস দেখা দেওয়ার পর থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে প্রথম থেকেই নানা রকম প্রশ্ন দেখা দেয়। এমনকি দেশের অনেক হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্য কর্মীরাও এই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে নানা রকম কথা বলেন। এছাড়া বিভিন্ন মহলে এই করোনা ভাইরাসের সরঞ্জাম নিয়েও নানা রকম অভিযোগ উঠে এসেছে। আর ইতিমধ্যে দেশে করোনা ভাইরাসের সুরক্ষার জন্য নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে এক নারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এরপরও এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই সকল অভিযোগ উঠে এসেছে যার কারণে আবরও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।