দেশ থেকে তরুণীদের চাকরি দেওয়ার কথা বলে দালাল চক্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাই নিয়ে যায়। আর দেশে কম বয়সি তরুণীদের সংগ্রহ করে আরও কয়েটি দালাল চক্র। তবে এই সকল তরুণীদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দুবাই নিয়ে গিয়ে দালালরা নানা রকম অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত করে। এমনকি তাদের সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করা হয়। আর এবার দুবাইয়ের স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি তরুণীরা এই সকল বিষয়ে মুখ খুলেছে। এছাড়া এই সকল তরুণীরা সেখানে কোনো প্রতিবাদ করতে পারতো না। কোনো প্রতিবাদ করলেই তাকে শেষ করার হু’মকি দেওয়া হতো।

দুবাইতে ড্যান্স বারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হোটেলগুলোতে নিয়ে বাধ্য করা হতো দে’হ ব্যবসায়, রাজি না হলেই মাসের পর মাস চলতো নি’র্যা’ত’ন। এমন আরও লো’ম’হর্ষ’ক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন দুবাইয়ের বিভিন্ন হোটেল থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি তরুণীরা।
জানা গেছে, ঢাকায় একাধিক ড্যান্স শেখানোর প্রতিষ্ঠান রয়েছে একটি পাচার চক্রের। সেখান থেকেই ড্যান্স শেখানোর নামে মেয়েদের সংগ্রহ করে পাচার করা হয় দুবাইয়ে। প’তি’তা’বৃ’ত্তির বিনিময়ে বিপুল টাকা অর্জিত হলেও নি’র্যা’তি’তাদের অনেকের ভাগে তা জুটে না। কেউ কেউ মাস শেষে অল্প টাকা পান। এ রকম সহস্রাধিক তরুণীকে পাচার করেছে আজম খান চক্র।
এ চক্রটি দালালদের মাধ্যমে তরুণীদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে যায়। তারপরই তাদের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। তেমনি নি’র্যা’তনের শিকার এক তরুণী জানান, প্রতিবেশী এক নারীর মাধ্যমে টিএসসিতে পরিচয় হয় নির্মল দাস নামে এক যুবকের সঙ্গে। নির্মল তাকে জানান, দুবাইয়ে ভালো চাকরি আছে। বেতন হবে প্রায় অর্ধলাখ টাকা-এমন প্রলোভন দেখিয়ে ওই তরুণীকে নারায়ণগঞ্জের জালকুড়ি পাসপোর্ট অফিসে নিয়ে যান। সেখানে পাসপোর্ট করার জন্য আবেদন করা হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর চাকরির আলোচনার কথা বলে নির্মল ফোনে ডেকে নিয়ে যায় শান্তিনগরে। সেখানে পরিচয় হয় নাজিম খানের সঙ্গে। আজম খানের ছোট ভাই নাজিম। গাড়িতে বসেই ওই তরুণীর সঙ্গে কথা বলেন সেদিন।
তিনি ওই তরুণীকে জানান, দুবাইয়ে তাদের কয়েকটি হোটেল আছে। সেখানে কাজ করতে হবে। কাজ হচ্ছে গেস্টদের খাবার পরিবেশন করা। হোটেল ব্যবসা যাই হোক মাস শেষে নিয়মিত ৫০ হাজার টাকা পাবেন।
তার কিছুদিন পরে ফোনে নাজিম জানান, ২৩ ডিসেম্বর তার ফ্লাইট। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে গাড়িতে পাসপোর্ট, ভিসা, বিমানের টিকিট দেয় নাজিম। ওই সময়ে ওই তরুণীর মায়ের বিকাশ নম্বরে দুই দফায় ৪০ হাজার টাকা পাঠান নাজিম। দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়ার পর ওই তরুণীর কপালে জোটে বন্দি জীবন। রুমের বাইরে তালা। প্রয়োজন হলেই রুম খুলে ড্যান্সবারে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে মদে বুঁদ হয়ে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে নাচতে হতো। তারপর যখন তখন রুমে পাঠানো হতো গেস্ট। কখনো কখনো এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে নিয়ে যাওয়া হতো। প্রতিটি হোটেল অন্তত ২০ জন করে তরুণী রয়েছেন এই চক্রের। তাদের প্রত্যেককে দিয়েই এ কাজ করানো হয়। যারা স্বতপ্রণোদিত হয়ে নাচ করে তাদের ভাগ্যে অল্প-স্বল্প টাকা জুটলেও বেশিরভাগ তরুণীকেই কোনো টাকা দেয়া হয় না। হোটেলগুলো পরিচালনা করতো আজম খান। বারে, লবিতে তার দেখা মিলতো।
নি’র্যা’তনের শিকার কয়েকজন তরুণী জানান, করোনার কারণে গত এপ্রিল মাস থেকে হোটেল, বার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর নিয়মিত খাবার না পেয়ে কষ্টে দিনপার করছিল তারা। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল অফিসের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে কল দিয়ে অভিযোগ করেন তারা। পরে হোটেল থেকে কয়েকজন তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। ১৬ জুন দেশে ফেরেন তাদের মধ্যে কয়েকজন।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নানুপুরের আজম খানসহ এ চক্রের আল আমিন হোসেন ডায়মন্ড, স্বপন হোসেন, নাজিম, এরশাদ, নির্মল দাশ, আলমগীর, আমান, শুভসহ অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় মানবপাচার আইনে মামলা করেছে সিআইডি।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজীব ফারহান জানান, এ চক্রের টার্গেট থাকতো কম বয়সী সুন্দরী নারী। তাদের মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে ভ্রমণ ভিসায় দুবাই নিয়ে যেত। সেখানে যৌ’ন নি’র্যা’তন করা হতো। এক ধরনের দাসত্বের জীবন যাপন করতে হতো পাচার হওয়া নারীদের। টাকাও দেয়া হতো না। উল্টো মা’র’ধর করা হতো। এ চক্রের গ্রেফতার তিনজনের মধ্যে আজম খান ও আল আমিন হোসেন ডায়মন্ড অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। অন্যদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
জানা গেছে, দুবাইয়ে মেট্টো নাইট ক্লাব, ঢলিউড লাইভ ইন্ডিপেন্ডেন্ট রেস্টুরেন্ট, (হোটেল সিটি টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায়), গুলশান লাইভ ইন্ডিপেন্ডেন্ট রেস্টুরেন্ট ও রয়েল ফরচুন নামে চারটি হোটেল রয়েছে আজম খানের। এই চক্রে দেশি ছাড়া পাকিস্তানিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।

এদিকে, দেশে প্রায় সময় কিছু দালাল চক্র দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সুন্দরি তরুণীদের নানা ভাবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দুবাই নিয়ে গিয়ে নানা রকম খারাপ কাজ করোনো হয়। তবে দেশ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় এই সকল তরুণীদের পরিবারকে নানা ভাবে ভুল-ভাল বুঝানো হয়। এছাড়া সেখানে গিয়ে অনেক অর্থ আয় করতে পারবেন এমন প্রলোভন দেখানো হয়। তবে দুবাই নেওয়ার পর সেখানে পর সেখানে অবস্থানরত দালাল চক্র অনেক সময় অন্য দালালদের কাছে তরুণীদের বিক্রয় করে দেয়। আর এর ফলে অনেক তরুণীর জীবনে নেমে আসে অনেক বড় বিপদ।
চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক কাজ, ঘটনার বর্ণনা দিলো দুবাইয়ের হোটেল থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি তরুণীরা
Logo
Print

বিশেষ প্রতিবেদন

 

দেশ থেকে তরুণীদের চাকরি দেওয়ার কথা বলে দালাল চক্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাই নিয়ে যায়। আর দেশে কম বয়সি তরুণীদের সংগ্রহ করে আরও কয়েটি দালাল চক্র। তবে এই সকল তরুণীদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দুবাই নিয়ে গিয়ে দালালরা নানা রকম অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত করে। এমনকি তাদের সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করা হয়। আর এবার দুবাইয়ের স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি তরুণীরা এই সকল বিষয়ে মুখ খুলেছে। এছাড়া এই সকল তরুণীরা সেখানে কোনো প্রতিবাদ করতে পারতো না। কোনো প্রতিবাদ করলেই তাকে শেষ করার হু’মকি দেওয়া হতো।

দুবাইতে ড্যান্স বারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হোটেলগুলোতে নিয়ে বাধ্য করা হতো দে’হ ব্যবসায়, রাজি না হলেই মাসের পর মাস চলতো নি’র্যা’ত’ন। এমন আরও লো’ম’হর্ষ’ক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন দুবাইয়ের বিভিন্ন হোটেল থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি তরুণীরা।
জানা গেছে, ঢাকায় একাধিক ড্যান্স শেখানোর প্রতিষ্ঠান রয়েছে একটি পাচার চক্রের। সেখান থেকেই ড্যান্স শেখানোর নামে মেয়েদের সংগ্রহ করে পাচার করা হয় দুবাইয়ে। প’তি’তা’বৃ’ত্তির বিনিময়ে বিপুল টাকা অর্জিত হলেও নি’র্যা’তি’তাদের অনেকের ভাগে তা জুটে না। কেউ কেউ মাস শেষে অল্প টাকা পান। এ রকম সহস্রাধিক তরুণীকে পাচার করেছে আজম খান চক্র।
এ চক্রটি দালালদের মাধ্যমে তরুণীদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে যায়। তারপরই তাদের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। তেমনি নি’র্যা’তনের শিকার এক তরুণী জানান, প্রতিবেশী এক নারীর মাধ্যমে টিএসসিতে পরিচয় হয় নির্মল দাস নামে এক যুবকের সঙ্গে। নির্মল তাকে জানান, দুবাইয়ে ভালো চাকরি আছে। বেতন হবে প্রায় অর্ধলাখ টাকা-এমন প্রলোভন দেখিয়ে ওই তরুণীকে নারায়ণগঞ্জের জালকুড়ি পাসপোর্ট অফিসে নিয়ে যান। সেখানে পাসপোর্ট করার জন্য আবেদন করা হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর চাকরির আলোচনার কথা বলে নির্মল ফোনে ডেকে নিয়ে যায় শান্তিনগরে। সেখানে পরিচয় হয় নাজিম খানের সঙ্গে। আজম খানের ছোট ভাই নাজিম। গাড়িতে বসেই ওই তরুণীর সঙ্গে কথা বলেন সেদিন।
তিনি ওই তরুণীকে জানান, দুবাইয়ে তাদের কয়েকটি হোটেল আছে। সেখানে কাজ করতে হবে। কাজ হচ্ছে গেস্টদের খাবার পরিবেশন করা। হোটেল ব্যবসা যাই হোক মাস শেষে নিয়মিত ৫০ হাজার টাকা পাবেন।
তার কিছুদিন পরে ফোনে নাজিম জানান, ২৩ ডিসেম্বর তার ফ্লাইট। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে গাড়িতে পাসপোর্ট, ভিসা, বিমানের টিকিট দেয় নাজিম। ওই সময়ে ওই তরুণীর মায়ের বিকাশ নম্বরে দুই দফায় ৪০ হাজার টাকা পাঠান নাজিম। দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়ার পর ওই তরুণীর কপালে জোটে বন্দি জীবন। রুমের বাইরে তালা। প্রয়োজন হলেই রুম খুলে ড্যান্সবারে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে মদে বুঁদ হয়ে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে নাচতে হতো। তারপর যখন তখন রুমে পাঠানো হতো গেস্ট। কখনো কখনো এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে নিয়ে যাওয়া হতো। প্রতিটি হোটেল অন্তত ২০ জন করে তরুণী রয়েছেন এই চক্রের। তাদের প্রত্যেককে দিয়েই এ কাজ করানো হয়। যারা স্বতপ্রণোদিত হয়ে নাচ করে তাদের ভাগ্যে অল্প-স্বল্প টাকা জুটলেও বেশিরভাগ তরুণীকেই কোনো টাকা দেয়া হয় না। হোটেলগুলো পরিচালনা করতো আজম খান। বারে, লবিতে তার দেখা মিলতো।
নি’র্যা’তনের শিকার কয়েকজন তরুণী জানান, করোনার কারণে গত এপ্রিল মাস থেকে হোটেল, বার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর নিয়মিত খাবার না পেয়ে কষ্টে দিনপার করছিল তারা। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল অফিসের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে কল দিয়ে অভিযোগ করেন তারা। পরে হোটেল থেকে কয়েকজন তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। ১৬ জুন দেশে ফেরেন তাদের মধ্যে কয়েকজন।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নানুপুরের আজম খানসহ এ চক্রের আল আমিন হোসেন ডায়মন্ড, স্বপন হোসেন, নাজিম, এরশাদ, নির্মল দাশ, আলমগীর, আমান, শুভসহ অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় মানবপাচার আইনে মামলা করেছে সিআইডি।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজীব ফারহান জানান, এ চক্রের টার্গেট থাকতো কম বয়সী সুন্দরী নারী। তাদের মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে ভ্রমণ ভিসায় দুবাই নিয়ে যেত। সেখানে যৌ’ন নি’র্যা’তন করা হতো। এক ধরনের দাসত্বের জীবন যাপন করতে হতো পাচার হওয়া নারীদের। টাকাও দেয়া হতো না। উল্টো মা’র’ধর করা হতো। এ চক্রের গ্রেফতার তিনজনের মধ্যে আজম খান ও আল আমিন হোসেন ডায়মন্ড অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। অন্যদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
জানা গেছে, দুবাইয়ে মেট্টো নাইট ক্লাব, ঢলিউড লাইভ ইন্ডিপেন্ডেন্ট রেস্টুরেন্ট, (হোটেল সিটি টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায়), গুলশান লাইভ ইন্ডিপেন্ডেন্ট রেস্টুরেন্ট ও রয়েল ফরচুন নামে চারটি হোটেল রয়েছে আজম খানের। এই চক্রে দেশি ছাড়া পাকিস্তানিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।

এদিকে, দেশে প্রায় সময় কিছু দালাল চক্র দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সুন্দরি তরুণীদের নানা ভাবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দুবাই নিয়ে গিয়ে নানা রকম খারাপ কাজ করোনো হয়। তবে দেশ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় এই সকল তরুণীদের পরিবারকে নানা ভাবে ভুল-ভাল বুঝানো হয়। এছাড়া সেখানে গিয়ে অনেক অর্থ আয় করতে পারবেন এমন প্রলোভন দেখানো হয়। তবে দুবাই নেওয়ার পর সেখানে পর সেখানে অবস্থানরত দালাল চক্র অনেক সময় অন্য দালালদের কাছে তরুণীদের বিক্রয় করে দেয়। আর এর ফলে অনেক তরুণীর জীবনে নেমে আসে অনেক বড় বিপদ।
Template Design © Joomla Templates | GavickPro. All rights reserved.