গত কয়েকদিন ধরে বেশ কয়েকটি সংগঠন বর্তমান সমিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। আর এই সকল আন্দোলনকারিরা বলছে তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। এদিকে, আন্দোলনকারিদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী। আর আবার অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। আর অনেক অভিনেতা- অভিনেত্ররা এই বিষয়ে মুখ খুলছেন। এবার তেমনি আরও এক চিত্রনায়িকা এই বিষয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন। তিনি হলেন জনপ্রিয় নায়িকা পপি। তিনি বর্তমান সমিতি সম্পর্কে নানা রকম কথা বলেছেন।

কথার শুরুতেই পপি জানান শিল্পী সমিতির নেতৃত্বে থাকার সময়কার চাপা কিছু কষ্টের কথা। অতীতের স্মৃতিচারণও করলেন। তিনি বলেন, এফডিসি নির্মাণ করেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার স্বপ্নের জায়গায়ই আজকের এই ফিল্ম ইন্ড্রাস্টি দাঁড়িয়ে। অথচ সেখানে আজ অযোগ্য লোকের নেতৃত্বে জিম্মি চলচ্চিত্রের শিল্পী ও তাদের সমিতি।

দেখুন আমরা সবাই স্বাধীন দেশের নাগরিক। কেউই কিন্তু পরাধীন নয় এবং স্বৈরাচারী বিষয়টির সাথে কোনোভাবেই রিলেটেড না। তাহলে পরাধীনতা কিংবা স্বৈরাচারিতা সিনেমায় চলছে কেন? এই দুটি শব্দ যেন আর এখানে উচ্চারিত না হয় সেটাই আমার প্রথম চাওয়া।

গত কয়েক দিন ধরেই মনটা ভিষণ খারাপ। ইন্ডাস্ট্রি এমনিতেই ভালো না। তার ওপর শুরু হয়েছে স্বৈরাচারদের মানসিক অত্যাচার। চলছে বিক্ষোভ। একজন শিল্পী থাকবে নরম মনের। এখানে দেখা যাচ্ছে পাষণ্ডদের রাজত্ব। যারা নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে তুলেছে, সিনেমা হয়ে গেছে গৌণ।

আজ যারা রাস্তায় নেমেছে এরা প্রত্যেকেই শিল্পী ও ভোটার ছিল শিল্পী সমিতির। এদের ভোটেই কিন্তু আজকের শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছেন। তারা তা ভুলে গেছেন। যে চেয়ারটায় জায়েদ খান বসেন সেটা তিনি পেয়েছেন আমাদের সবার ভোটেই। অথচ চেয়ারে বসেই ১৮৪ জন শিল্পীর ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছেন। এটিকে বেঈমানি বলা যায়। আমরা যারা তখন কমিটিতে ছিলাম অনেকেই এটার প্রতিবাদ করেছিলাম। কারো কথাই শোনা হয়নি। একের পর এক অনিয়মকে তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে। এসব কারণেই আমাদের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। তারা চেয়েছে আমরা যেন দূরে সরে আসি। মিটিংয়ে না যাই। কমিটিতে অ্যাক্টিভ না থাকি। শুধু যখন টাকার দরকার পড়েছে আমাদের ডাক পড়তো। নইলে তারা চাইতো না আমরা এফডিসিতে যাই। সবাইকে বুঝিয়েছিলাম বিষয়টি। শিল্পীরা বোঝেননি। অনেক সিনিয়ররাও আবেগী ও কৌশলী ফাঁদে পা দিয়ে সমর্থন দিয়ে আবার ক্ষমতায় এনেছে।

তারই দায় আজ শোধ করতে হচ্ছে। বা বলেন ভুলের খেসারত। শিল্পীদের এই করোনার আতঙ্কের মধ্যেও রাস্তায় নামতে হয়েছে। এই প্রথম শিল্পীরা তাদের কোনো নেতার পদত্যাগ চাইলো। এটা দুঃখজনক। তারা যাকে তাকে অপমান করে। সিনিয়র-জুনিয়র মানে না। নিজেদের মতের বিরুদ্ধে গেলে শত্রু ভেবে নেয়, ক্ষতি করার চেষ্টা করে। আমি চাই দ্রুত এসব বিষয়ের মীমাংসা হোক। যে সিনেমাকে ধারণ করে না তার কোনো অধিকার নেই সিনেমার মানুষদের নেতৃত্ব দেয়ার। মুখোশধারীদের মুখোশ যখন খুলছে সেটা তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হোক।’

পপি আরও বলেন, ’অনেকে ২০ বছর আগে সিনেমায় কাজ করেছেন। এখন নিয়মিত নন বলে অনেকের সদস্যপদ কেড়ে নেয়া হচ্ছে। যদি এই নিয়মে কাউকে বাদ দেয়া হয় তাহলে তো শত শত শিল্পীর সদস্যপদ থাকবে না। এটিএম শামসুজ্জামান আংকেল, ফারুক ভাই, সোহেল রানা ভাই, কাঞ্চন ভাইদের মতো কিংবদন্তিরাও বাদ পড়বেন। কারণ তারা অনেক দিন সিনেমায় কাজ করেন না। শাবানা-কবরী-ববিতা আপারাও থাকতে পারবেন না। আনোয়ারা ম্যাডাম, সুচন্দা ম্যাডামরা বাদ যাবেন। কারণ কেউই আর আগের মতো কাজ করেন না। এটা একটা ফালতু অজুহাত। ওরা খুঁজে খুঁজে বের করেছে কারা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাদেরই ছাঁটাই করেছেন। এটা অন্যায়। শিল্পী সে চিরদিন শিল্পী। এজন্যই একজন শিল্পী মারা গেলে রাষ্ট্র তাকে সম্মান জানায়। কিন্তু দেখুন নাচের শিল্পী বা ফাইটের শিল্পী যারা শিল্পী সমিতির সদস্য তাদের কিন্তু ভোটাধিকার বাতিল করা হয়নি। কারণ তারা জায়েদের পক্ষের লোক। এটা শিল্পীর নীতি নয়, নোংরা রাজনীতি।

যারা আজ রাস্তায় নেমেছেন তারা অনেকেই শাবানা আপা, কবরী আপা, ববিতা আপাদের সাথে কাজ করেছেন। আমাদের প্রজন্মের সঙ্গেও কাজ করেছেন। এখনকার প্রজন্মের সঙ্গেও কাজ করছেন। বাদ পড়াদের মধ্যে এমন শিল্পীও আছে যার সিনেমার সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এরা খুব বেশি অর্থ, সম্মান বা পরিচিতি পাননি। শিল্পী সমিতির সদস্য হিসেবে গর্ববোধ করেন। সেটাও কেড়ে নেয়া হলো। আজ তাদের মনের কি অবস্থা? ফারুক ভাই এ নিয়ে কিছু তো বললেন না! তিনি মুরুব্বি, পূজনীয় আমাদের সবার কাছে। তাকে অভিভাবক হিসেবে সবাই মানি। তার কাছে নিরপেক্ষতা আশা করি। আমার মনে হয় উনার জাজমেন্ট হওয়া চাই দুই চোখের দৃষ্টিতে সমান।’

মিশা-জায়েদকে অবাঞ্ছিত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’সেই রাজ্জাক আংকেলদের সময় থেকে শিল্পী সমিতির যাত্রা। এরপর বহু শিল্পী এসেছেন। সবাই মিলেমিশে থেকেছেন। হ্যাঁ, যখন নির্বাচনের রাজনীতি আপনি করবেন আপনার কাছের মানুষটি প্রতিদ্বন্দ্বী হলে তার সঙ্গে একটা দূরত্ব হবেই। কিন্তু শিল্পী সমিতিতে এই দূরত্ব ছিল কেবলই নির্বাচন উপলক্ষে। নির্বাচন শেষ, সব শেষ। সবাই মিলেমিশে চলেছে একসঙ্গে। এখানে ব্যক্তি রেষারেষিটা শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগে। সেটি নোংরামির অবস্থায় পৌঁছেছে জায়েদ খান নির্বাচনে আসার পর থেকে। জসিম ভাই, ইলিয়াস ভাই, ওমর সানি ভাই, বাপ্পারাজ ভাই, রিয়াজ, ফেরদৌস, আমিন খান, অমিত হাসান, শাকিব খান, ববিতা আপু, শাবানা আপু, মৌসুমী ও শাবনূর আপু, আমি, পূর্ণিমা- সবাই কিন্তু সোনালি সময় পার করে এসেছি। অনেক শিল্পী ছিল। প্রতিযোগিতা অনেক বেশি ছিল। তখন কিন্তু শিল্পীদের মধ্যে এতো বিভাজন ছিল না।

কিন্তু এই একজনের জন্য চলচ্চিত্রে আজ এত দলাদলি, নোং’রা রাজনীতি চলছে। এত ঝামেলা হচ্ছে। শাকিব খান একজন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা। তাকে কিন্তু অবাঞ্ছিত ও বয়কট করা হয়েছিল। অনেক কারণ ছিল। তাকে বয়কট করে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। ভুল যেই করুক শাস্তি সে পাবেই। হয়তো শাকিবের কিছু ভুল ছিল। কিন্তু সেই ভুলগুলো জায়েদ আরও ঘোলা করেছে পলিটিক্স করে। বি গ্রেডের একজন হিরো যখন এ গ্রেডের একজন নায়কের সাথে পলিটিক্স করেছে এবং নিষিদ্ধ করেছে তখন সবাই কোথায় ছিলেন? তখন কিন্তু ফারুক ভাই বলেননি এই শিল্পীকে কেন বয়কট করা হয়েছে।

এর আগে এই আন্দোলনরত চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ১৮টি সংগঠনের সাথে একাত্র প্রকাশ করেছে চিত্রনায়িকা মৌসুমি। এছাড়া নিত্রনায়ক রিয়াজও তাদের সম্পর্কে কথা বলেছেন। চিত্রনায়ক রিয়াজ বলেন কাউকে বাদ দিয়ে চলচ্চিত্র সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে না। তেমনি চিত্রনায়িকা পপি বলেছেন বর্তমানে সমিতিতে নানা রকম অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন এই সমিতিতে কফির বিল আসে চার লাখ টাকা। তিনি বলেন এখনে আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজন যায় না এছাড়া শিল্পীদেরও কোনো কফি দেওয়া হয়না। তাহলে এতো বিল কিভাবে আসে। এছাড়া বর্তমান সমিতির সম্পর্কে নানা অনিয়মের কথা বলেছেন চিত্রনায়িকা পপি।